দিঘার সমুদ্র সৈকত জীবনে অন্তত একবার ঘুরে আসেননি এমন বাঙালি খুবই বিরল । দিঘা শুধু ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির কাছেই প্রিয় এমন নয় , ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্যেকের ইচ্ছা থাকে অন্তত একবার দিঘা ঘুরে আসা । ইংরেজ শাসনে ইংরেজদের কাছেও বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সৈকতটি বেশ পছন্দের ছিল । বছরের পর বছর পরদেশে থাকা ইংরেজ অফিসাররা বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে দিঘার সমুদ্রের হাওয়া খেয়ে আসতেন , তারা দিঘাকে বলতেন ব্রাইটন অফ ক্যালকাটা । আসুন আমরাও টাইম মেশিনে চেপে দিঘার ইতিহাস জেনে আসি । 

দিঘার আবিষ্কার – 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহায্যে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে মীর কাসিম বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হন । মীর কাসিম নবাব হয়ে মেদিনীপুরের অধিকার ইস্ট ইন্ডিয়াকে ছেড়ে দেন । তখন মেদিনীপুর একটি চাকলা ছিল , চাকলা অনেকটা বর্তমান সময়ের জেলার মতো , তবে জেলা থেকে অনেক বড়  । মেদিনীপুর চাকলাতে ৫৪টি পরগনা ছিল । পরগনা আজকালকার সাব ডিভিশন বা উপজেলার মতো । ৫৪টি পরগনার সমুদ্র উপকূলবর্তী পরগনাটির নাম ছিল বীরকুল পরগনা । বীরকুল পরগনার সমুদ্র উপকূলবর্তী একটি অখ্যাত গ্রাম ছিল দিঘা । ১৭৬০ সালে মেদিনীপুরের সাথে দিঘা গ্রামেরও অধিকার ইস্ট ইন্ডিয়ার কোম্পানির কাছে চলে আসে । 

১৭৬৭ সালে কোন এক গরমের দিনে ওয়ারেন হেস্টিংস হাতির পিঠে চেপে উড়িষ্যা থেকে কোলকাতা ফিরছিলেন । ফেরার পথে বীরকুলের দিঘা গ্রামে তিনি বিশ্রাম নেন । ঝাউ ও নারিকেল বনে ঘেরা দিঘার সমুদ্র সৈকত তার খুব ভালো লেগে যায় । বঙ্গোপসাগরের ঠাণ্ডা বাতাস তার সব ক্লান্তি দূর করে দেয় , অনেকদিন পর নিজের জন্মভূমি ব্রাইটনের কথা মনে পরে যায় , হেস্টিংসের মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে আসে – ব্রাইটন অফ ক্যালকাটা । 

এরপর ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতের প্রথম গর্ভনর জেনারেল হওয়ার পর ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে আবার দিঘা ফিরে আসেন ও নিজের জন্য একটি বাংলো তৈরি করেন । তারপর ইংরেজ অফিসারদের সপরিবারে ছুটি কাটানোর জন্য আরো কয়েকটি বাংলো বাড়ি তৈরি করা হয় । বীরকুলের অখ্যাত গ্রাম দিঘার সমুদ্র সৈকত পরিচিত হতে থাকে ব্রাইটন অফ ক্যালকাটা নামে । 

দিঘার প্রথম নাগরিক – 

ওয়ারেন হেষ্টিংস ও কিছু ইংরেজ অফিসারের কাছে দিঘা গ্রামের সমুদ্র সৈকত ব্রিটেন অফ ক্যালকাটা নামে পরিচিত হলেও খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি তখনও , এর অন্যতম কারন কলকাতা থেকে দিঘা যাওয়ার পথ ছিল বেশ দূর্গম । পথে রূপনারায়ণ নদ, হলদি নদী ও রসুলপুর নদীর মতো বড় নদীতে কোন ব্রিজ না থাকায় দিঘা যাওয়া ছিল অনেক সময়ের ব্যাপার , কলকাতা থেকে দিঘা পৌঁছাতে দুই তিন দিন লেগে যেত । 

অন্যদিকে দিঘার সমুদ্র ক্ষয়কারী চরিত্রের –  মানে দিঘার সমুদ্র সৈকতে সমুদ্রের অগ্রগামী তরঙ্গের তুলনায় বিপরীত তরঙ্গ বেশি শক্তিশালী । প্রতি ঢেউয়ে যে পরিমাণ বালি সমুদ্রতটে জমা হয় বিপরীত ঢেউয়ে তার থেকে বেশি বালি তট থেকে সমুদ্রে চলে যায় । এর ফলে দিঘার সমুদ্র ধীরে ধীরে দিঘা গ্রামকে গ্রাস করতে থাকে , দিঘাও তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে । 

দেড়শ বছর পরে কলকাতার বিখ্যাত ব্যবসায়ী হ্যামিলটন অ্যান্ড কোম্পানির মালিক ভ্রমণপ্রিয় ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলের পুরানো নথিপত্র ঘেঁটে সৈকত গ্রাম দিঘার কথা জানতে পারেন । দিঘার নিকটবর্তী বালিসাইয়ের জমিদার ছিলেন তার একজন কাস্টমার । বালিসাইয়ের জমিদারের কাছেও দিঘার সমুদ্রসৈকতের কথা শোনেন । ১৯২৩ সালের আর একটি গরমের দিনে ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ তার নিজের ওভারল্যান্ড গাড়িতে চড়ে বেলডা যান , বেলডা থেকে ঘোড়ায় কাঁথি , কাঁথি থেকে বালিসাইয়ের জমিদারের হাতিতে চেপে দিঘা পৌঁছান । দিঘাতে ওয়ারেন হেস্টিংসের বাংলোবাড়ি ততোদিনে সমুদ্রের তলায় , আরো যে বেশ কয়েকটি বিশ্রামাগার তৈরি করা হয়েছিল সবই ভগ্নস্তুপে পরিণত হয়েছে । 

ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো প্রকৃতিপ্রেমী ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথেরও দিঘার সমুদ্রসৈকত ভালো লেগে গেল । ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ তাঁবু খাটিয়ে কয়েকদিন দিঘার সৈকত উপভোগ করে কলকাতা ফিরে এলেন । প্রকৃতিপ্রেমী ফ্র্যাঙ্ক কলকাতায় এসে দিঘার সমুদ্র সৈকতে ৩৫ বিঘা জমি লিজ নেন , এরপর সেই জমিতে ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ তার স্বপ্নের বাড়ি রানসউইক হাউস তৈরি করেন , তিনি বছরের ছয় মাসই রানসউইক হাউসে বসবাস করতেন । প্রকৃতিপ্রেমী ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথই সৈকত সুন্দরী দিঘার প্রথম নাগরিক । 

সৈকত নগরী দিঘার রূপায়ণ – 

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হন বিধানচন্দ্র রায় । ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ বিধানচন্দ্র রায়কে দিঘাতে সৈকত নগরী গড়ে তোলার আবেদন করেন । দিঘাতে একে একে সৈকতাবাস, রাস্তাঘাট, জলসরবরাহ ব্যবস্থা , হোটেল , স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠে ।  বিধান চন্দ্র রায় কলকাতা থেকে দিঘার যাতায়াত পথ ভালো করেন , পিছাবনি খালের উপর ব্রিজ তৈরি করেন ফলে দিঘা যাওয়া আরো সহজ হয় । ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ সব দায়িত্ব সরকারের উপর ছেড়ে দেননি , দিঘাকে সৈকত নগরী তৈরি করতে তিনিও নিরলস পরিশ্রম করে যান । বেহালা ফ্লাইয়িং ক্লাব থেকে নিয়মিত পাইপার প্লেনে করে দিঘাতে আসতেন । নাড়জোলার রাজার সাহায্যে তিনি দিঘাতে স্কুল তৈরি করেন । ১৯৬৪ সালে দিঘার রূপকার ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ মারা যান , তার তৈরি রানসউইক হাউসেই তাকে কবর দেওয়া হয় । ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথের মৃত্যুর পর রানসউইক হাউস রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ কিনে নিয়ে অতিথিশালাতে পরিণত করে । 

এরপর দিঘা যাওয়ার রাস্তা যত ভালো হতে থাকে দিঘার সমুদ্র সৈকত তত জনপ্রিয় হতে থাকে । হলদি নদী, রসুলপুর নদীর উপর ব্রিজ তৈরি হলে কলকাতা থেকে দিঘা বাস পরিষেবা শুরু হয় । ২০০৪ সালের ৩১ সে ডিসেম্বর হাওড়া থেকে দিঘা রেল পরিষেবা শুরু হয় । সৈকত নগরী দিঘা বাঙালির কাছে সপ্তাহান্তের ভ্রমণস্থান হয়ে ওঠে । 

আবার যখন দিঘা যাবেন , ওল্ড দিঘাতে রানসউইক বাংলোতে একবার ঢুঁ মেরে আসবেন , দেখবেন প্রকৃতিপ্রেমী বুড়ো ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ প্রকৃতির কোলে এখনও শুয়ে আছেন , একটু ভালো করে শুনতে চেষ্টা করবেন নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাবেন – বুড়ো ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ নিঃশ্বাস নিচ্ছেন – নিঃশ্বাস মিলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের সাথে ।

আরো পড়ুন – দীঘা কি কি দেখবেন ?