তালসারি ভ্রমণ –

সমুদ্র সৈকত ধরে এক রাজ‍্য থেকে আরেক রাজ‍্য যাবার আনন্দ নিতে হলে আপনাকে যেতে হবে বঙ্গ উৎকল উপকূলভূমিতে। ভাবছেন তো সেটা আবার কোথায় ? আমাদের সকলের প্রিয় উদয়পুর তালসারি সমুদ্র সৈকত। বঙ্গ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের উদয়পুর সৈকত আর উৎকল অর্থাৎ উড়িষ‍্যার তালসালি সৈকত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তৈরি করে চলেছে এক বঙ্গ উৎকলীয় সংস্কৃতি, আর সেটা উপভোগ করতে আপনাকে দীঘা পেরিয়ে উদয়পুর হয়ে পৌঁছাতে হবে তালসারিতে।

তালসারি পশ্চিমবঙ্গের পার্শ্ববর্তী রাজ‍্য উড়িষ‍্যার বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত। এটি বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী পর্যটনকেন্দ্র।

● নামকরণের ইতিহাস –
উপকূলবর্তী এলাকা তালসারিতে তাল বা পাম এবং ঝাউগাছের আধিক‍্য একসময় প্রচুর পরিমাণে লক্ষ‍্য করা যেত। তাই ঝাউ বা পাম নয়, গ্রাম বাংলার চিরপরিচিত তাল গাছের সারি থেকে এলাকাটি তালসারি নামে পরিচিত হয়।

● দর্শনীয় স্থান –
উৎকল বঙ্গের সংযোগস্থলে তালসারি একটি নির্জন সমুদ্র সৈকত। যারা একটু নিরিবিলিতে প্রকৃতির মাঝে সমুদ্র সান্নিধ‍্য উপভোগ করতে চান তাদের জন‍্য পছন্দের তালিকার প্রথমের দিকে রাখা যেতে পারে তালসারি ভ্রমণের কথা।

৹ সমুদ্র
তালসারিতে বীচে অর্থাৎ সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভোরের সূর্যোদয় মন ভোলানো হলেও এর প্রধান আকর্ষণ বিকেলের সূর্যাস্ত আর আকাশের সঙ্গে সমুদ্রের রঙের খেলা। এই খেলা চলে দুপুর থেকে সন্ধে পর্যন্ত। আপনার ক‍্যামেরার চার্জ শেষ হয়ে যেতে পারে কিন্তু এখানকার মায়াবী প্রকৃতির পোজ শেষ হবে না, কথা দিলাম।

৹ ঝাউবীথি
তবে তালসারির মাহাত্ম‍্য সমুদ্র নয়, সমুদ্রকে পাশে রেখে তালসারি বীচ বা বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা তাল ও ঝাউগাছগুলি। মনের চোখ খোলা রাখলে অংশ নিতে পারবেন ওদের কথোপকথনে। ঠিক পাড়ার কাকিমাদের মতোই বসে বিকেলে ওদের আসর। ওদের সারির মাঝের সরু রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে শুনতে পাবেন তেলের দাম বা এস.এস.সি নয়, সভ‍্যতার আগের দিনগুলো ফিরে না পাবার আক্ষেপ।

৹ সুবর্ণরেখা নদী মোহনা –
সমুদ্র আর ঝাউবন পেরিয়ে এগিয়ে গেলে পাবেন সুবর্ণরেখা নদীর ক্লান্ত ও উচ্ছৃসিত মোহনা। সুদূর ঝাড়খন্ড থেকে আসতে গিয়ে ক্লান্ত হলেও সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হবার উচ্ছাস কার না থাকে !

৹ বোট রাইড –
তালসারি বীচেরর খেয়ালের সুরের সঙ্গে আপনার সুর মেলাতে সঙ্গী হবে নৌকাগুলোও। যখন জোয়ার তখন সমুদ্রের সঙ্গে খেলতে পারেন বোট রাইডের মাধ‍্যমে, আবার যখন ভাটা চলবে সম্ভবত বিকেলের দিকে সমুদ্রের ওপর হেঁটে কিংবা বিশ্রাম নেওয়া নৌকাগুলোর সঙ্গে ছবি তুলে মজা কুড়োতে পারবেন।

৹ লাল কাঁকড়া আর মাছ –
বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে আছেন অথচ লাল কাঁকড়ার সঙ্গে লুকোচুরিই খেললেন না তাহলে তো আপনার সমুদ্র সফর অসম্পূর্ণ মশাই। দূর থেকে রাঙা পলাশ ফুল ছাড়িয়ে আছে দেখবেন বেলাভূমি জুড়ে, কাছে গেলেই হাওয়া – দেখবেন গর্তে লুকিয়ে আপনাকে টুকি করছে
লাল কাঁকড়াগুলো। ওদের ধরে ছবি তুলতে গিয়ে ওদের বিরক্ত করবেন না। ভালো লেন্স নয়ত চোখের ক‍্যামেরাতেই বন্দি করুন ওদের।

লাল কাঁকড়ার পাশাপাশি জেলেদের মাছ ধরা, জাল গুটিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ‍্য‌ও আপনাকে সেরা ফটোগ্রাফারের প্রশান্তি দিতে পারে।  আর তারপর সন্ধ‍্যার দিতে এত্ত রকমের সামুদ্রিক মাছের যোগান, মাছ ভাজার গন্ধ আপনাকে এনে দিতে পারে ভূষুন্ডীর মাঠে থাকা সেই মেছোভূতের ফিলিংস।

৹ মন্দির –
এ তো গেল প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া। সঙ্গে যদি বয়স্করা থাকে তাদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন চন্দনেশ্বর মন্দির, পৃথিবীর বৃহত্তম শিবলিঙ্গ – ভূষণানন্দেশ্বর মন্দির আর একটু এগিয়ে জালেশ্বরের শিবশক্তি মন্দির।

কাজেই শিব আর সমুদ্রের বিশালতা একসঙ্গে উপভোগ করতে আসতেই হবে তালসারিতে।

তালসারি ভ্রমণের প্ল‍্যানে আরো একদিন বাড়িয়ে ঘুরে আসুন কাছেই বিচিত্রপুর থেকে, বিস্তারিত জানুন বিচিত্রপুর ভ্রমণে। 

● কীভাবে যাবেন –
তালসারি বীচের নিকটবর্তী রেল স্টেশন –
দীঘা, ১০কি.মি দূরে।

তাই, তালসারি যাবার সহজ পথ হল দীঘা। আপনার পছন্দের যে কোনো মাধ‍্যমে (বাস, ট্রেন, গাড়ি) দীঘা পৌঁছান, ওখান থেকে গাড়িতে ৩০মিনিটের সফরে পৌঁছে যাবেন তালসারি।

আর যারা বাইকে করে আসতে চান তালসারি বীচে, তারা কোলাঘাট – নন্দকুমার – কাঁথি দিয়ে অথবা বেলদা – এগরা – পানিরুল ধরে দীঘা আসতে পারেন নিজেদের সুবিধামতো।

কখন যাবেন –
       তালসারি ভ্রমণে যেকোনো সময়েই যেতে পারেন। তবে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা যেহেতু তুলনামূলক গরম থাকে তাই গরমকাল এবং কালবৈশাখী ঝড়ের সময় কাটিয়ে যাওয়াই ভালো। আবার গরমকালে গিয়ে গরম এড়াতে হলে এ.সি রুম ভাড়া করাই যায়। তালসারি বীচে পর্যটকরা সাধারণত ভিড় জমায় সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত।

আর চাকুরিজীবীদের জন‍্য তালসারি – দীঘাতোলা থাকে শনিবার, রবিবার কিংবা কোনো ছুটির দিন। তাই ব‍্যবসায়ী মানুষেরা তালসারির মনোরম উপকূলবর্তী পরিবেশ উপভোগ করার জন‍্য বেছে নিতে পারেন সপ্তাহের মাঝের দিনগুলিকে।

● কোথায় থাকবেন –
তালসারি ভ্রমণের প্ল‍্যানে পর্যটকরা বেশিরভাগ সময় রাখেন তালসারি – দীঘা একসঙ্গে। ফলে দীঘাতে হোটেলে থেকে যেকোনো একদিন বেছে নিতেই পারেন তালসারি বীচের জন‍্য। আর যেহেতু দীঘা জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত ফলে সেখানে হোটেল‌ও যেমন প্রচুর তেমনি হোটেলের ভাড়াও সকল পর্যটকদের পছন্দমতো পাওয়া যায়।
তবে ভ্রমণ গাইডের সাজেশন দীঘা তালসারি ট‍্যুরে দীঘায় থাকতে হলে নিউ দীঘায় হোটেলে থাকা বাঞ্ছনীয়।

আর যদি দীঘার কোলাহল থেকে নিজেকে দূরে রাখতে থাকতে চান তালসারিতেই, তবে থাকল ভ্রমণ গাইডের পক্ষ থেকে তালসারি বীচের গুটি কয়েক হোটেল ও যোগাযোগ নম্বর –
১) OTDC পান্থশালা / পান্থশালা চন্দনেশ্বর –
অনলাইনে ওদের ওয়েবসাইট থেকে কিংবা মৌলালির উৎকল ভবন থেকে বুকিং করতে পারেন।
২) Hotel Shree Inn –
9614666666 / 8249996260
৩) হোটেল সাগরকন‍্যা –
9777319993 / 7682074477
৪) হোটেল সমুদ্রসৈকত –
9734501903 / 9732518685
তালসারি বীচে হোটেলভাড়া মাথাপিছু ১২০০ থেকে ৫০০০ এর মধ‍্যে পেয়ে যাবেন।

~ ভ্রমণ.গাইড