কলকাতায় একদিন ~ পর্ব ১

ডিসেম্বর মানেই রবীন্দ্র সদন


ডিসেম্বর এসেছে, সোয়েটার টুপি মোজা বেরিয়েছে, এবার পালা বেড়াতে যাবার। নলেনগুড়ের রসগোল্লা, জয়নগরের মোয়া, রকমারি কেকের সঙ্গে হুজুগে বাঙালির কাছে শীতকাল মানেই মন ঘুরুঘুরু। আর যেহেতু এইসময় বাড়ির বাচ্চাদের পরীক্ষাও শেষ হয়ে যায় তাই ফ‍্যামিলি নিয়ে একবার কলকাতা সফর হয়েই যায়। আর একদিনে কলকাতার অনেককিছু দেখতে হলে চলে আসুন কলকাতার কেন্দ্র – রবীন্দ্রসদনে।

হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে কালীঘাট বা হেস্টিংসগামী যেকোনো বাসেই ২০- ৩০মিনিটের মধ‍্যে পৌঁছে যেতে পারেন রবীন্দ্রসদন।
অথবা ধূলাগড় সাঁতরাগাছি থেকে দ্বিতীয় হুগলি সেতু পেরিয়েও হেস্টিংস পি.টি.এস ধরে চলে আসতে পারেন রবীন্দ্রসদনে।

কী কী দেখবেন

১) আলিপুর চিড়িয়াখানা
২) জাতীয় গ্রন্থাগার
৩) ভিক্টোরিয়া
৪) মোহরকুঞ্জ
৫) নন্দন
৬) রবীন্দ্র ভবন
৭) গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শনশালা
৮) অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস
৯) সেন্ট পলস ক‍্যাথিড্রাল
১০) বিড়লা প্ল‍্যানেটোরিয়াম
১১) অরবিন্দ ভবন
    
       রবীন্দ্রসদনে এসে এই দশটি জিনিস আপনি পাবেন দেখার এবং উপভোগ করার জন‍্য। ভ্রমণগাইডের পক্ষ থেকে এই দশটি স্থান নিয়ে থাকল সংক্ষিপ্ত আলোচনা। আপনি আপনার অবস্থান ও পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো এক বা একাধিক স্থান সিলেক্ট করে আপনার কলকাতা সফর প্ল‍্যান করতেই পারেন –

১) আলিপুর চিড়িয়াখানা


হেস্টিংস থেকে জিরাট সেতু ধরে এগোলে ডানদিকেই পড়বে আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রবেশদ্বার।
  

উনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পশু উদ‍্যান গড়ে উঠতে থাকলে ব্রিটিশরা কলকাতায় একটি পশু উদ‍্যান করার পরিকল্পনা নেন। সেই ভাবনা থেকেই কালক্রমে আলিপুরে গড়ে ওঠে এই চিড়িয়াখানা। ১৮৭৬ সালের ১লা জানুয়ারি প্রিন্স অফ ওয়েলস সপ্তম এড‌ওয়ার্ড আলিপুর চিড়িয়াখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রথমদিকে ভারতীয় রেল‌ওয়ে স্টেশনে কর্মরত জার্মানি ইলেকট্রিশিয়ান লুইস সোয়েন্ডলারের ব‍্যক্তিগত পশুসংগ্রহ নিয়েই চিড়িয়াখানা সাজানো হয়েছিল। পরবর্তীকালে সাধারণ জনগণ ও চিড়িয়াখানার কর্মকর্তাদের প্রয়াসে আরো আকর্ষণীয় ও উন্নত করে তোলার প্রয়াস চলছে।

খোলার সময় – প্রতিদিন – সকাল ৯ টা থেকে ৪.৩০মি।

২) জাতীয় গ্রন্থাগার

আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে একটু এগোলেই চোখে পড়বে কলকাতার ঐতিহ‍্য সুপ্রাচীন ও সুবিশাল জাতীয় গ্রন্থাগার।
    

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুর্দা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৩৬ সালে গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ লাইব্রেরির ৪৬৭৫টি ব‌ই নিয়ে শুরু হয় এর পথ চলা ক‍্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি নামে। এরপর ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির সঙ্গে একে যুক্ত করে দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাব্রেরির ঠিকানা বদলে যায় এসপ্ল‍্যানেড। স্বাধীনতার পর আবার আলিপুরে ফিরে আসে, নাম হয় জাতীয় গ্রন্থাগার বা ন‍্যাশানাল লাইব্রেরি। ১৯৫৩ সালে ১লা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ লাইব্রেরিকে সকলের জন‍্য উন্মুক্ত করে দেন।

৩) ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

ইংল‍্যন্ডের মহারাণী ভারতসম্রাজ্ঞী উপাধি প্রাপ্ত  ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিসৌধ‌ই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। এটি বর্তমানে পরাধীন ভারতের স্মৃতি বহন করে প্রদর্শনশালাতে পরিণত হয়েছে।মূল ভবন ছাড়া দুদিকে প্রবেশদ্বার থেকে ভেতরে ভবন পর্যন্ত দুটি প্রকান্ড জলাধার এবং উদ‍্যান আছে। সৌধের শিরে শিরোমণি হয়ে আছে একটি কালো ব্রোঞ্জের বিজয়মূর্তি আর হাওয়া মোরগ।
স্মৃতি সৌধটির নির্মাণকার্য শুরু হয়েছিল ১৯০৬খ্রি:, উদ্বোধন হয় ১৯২১খ্রি:। সৌধটির নকশা প্রস্তুত করেন উইলিয়ম এমারসন এবং সৌধ সংলগ্ন বাগানের নকশা প্রস্তুত করেন জন প্রেইন এবং লর্ড রেডেসডেল।

★ খোলার সময় -প্রতিদিন – সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা।

৪) মোহরকুঞ্জ
        

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের ঠিক পাশেই অবস্থিত মোহরকুঞ্জ, যার পূর্ব নাম সিটিজেন্স পার্ক। ২০০৫ সালে কলকাতা পৌরসংস্থা এটি তৈরি করে নাম দেন সিটিজেন্স পার্ক, যা মূলত শহরের ইট পাথরের মধ‍্যে আটকে পড়া বয়স্কদের প্রাণকেন্দ্র হিসাবে তৈরি করা হয়। পরবর্তীকালে, ২০০৭ সালে প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কণিকা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের ডাক নাম মোহর অনুসারে উদ‍্যানের নামকরণ করা হয় মোহরকুঞ্জ। উদ‍্যানে নানারকম ফুল গাছের দেখা মিললেও প্রধান আকর্ষণ গানের তালে চলতে থাকা রঙিন ফোয়ারা। তাই মোহরকুঞ্জর মূলত সন্ধেবেলায় নয়নাভিরাম হলেও বিকালে বিশ্রাম নেবার জন‍্য কিংবা একসঙ্গে অনেকে মিলে আড্ডা দেবার জন‍্য‌ও উপযুক্ত।

খোলার সময় –

প্রতিদিন – সকাল ৫টা থেকে ৯টা
   বিকাল ৩টে থেকে সন্ধে ৮টা।

৫) – ৮) নন্দন ও অন‍্যান‍্য
      

মোহরকুঞ্জের ঠিক বিপরীতেই পেয়ে যাবেন নন্দন, নন্দন কলকাতার সংস্কৃতির পীঠস্থান। এখানে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান‌ও বিভিন্ন সময় বিশেষত শীতকালে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন‍্য তিনটি প্রেক্ষাগৃহ আছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক নন্দন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৫সালের ২রা সেপ্টেম্বর। নন্দন প্রতীকচিহ্ন অঙ্কন ও দ্বারোদঘাটন করেন প্রখ‍্যাত চিত্রপরিচালক সত‍্যজিৎ রায়। নন্দনের মধ‍্যেই রয়েছে  মূলত রবীন্দ্র সঙ্গীতচর্চাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্র ভবন। এছাড়া নন্দনের একপাশে রয়েছে চিত্রকলা ও ছবি প্রদর্শনী কেন্দ্র গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শন শালা এবং অপরদিকে রয়েছে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস যেখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রদর্শনী ও অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। কলকাতাসহ বিভিন্ন প্রান্তের সংস্কৃতিপিপাসু মানুষের কাছে পীঠস্থান বলা যেতে এই নন্দন চত্বর।

৯) সেন্ট পলস ক‍্যাথিড্রাল

অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস পেরিয়ে ময়দানের দিকে এগোলেই ডানদিকে সেন্ট পলস ক‍্যাথিড্রাল।

ব্রিটিশরা তাদের অন্তর্গত বিদেশি রাষ্ট্রগুলিতে যেসব ক‍্যাথিড্রাল গঠন করে তাদের মধ‍্যে এটি প্রথম। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, এটি কলকাতার বৃহত্তম ক‍্যাথিড্রাল এবং এশিয়ার বৃহত্তম এপিস্কোপিক‍্যাল চার্চ। চার্চটির ভেতরে একটি প্রদর্শনশালা ও একটা বাগান আছে। তাছাড়া,বড়দিনের মরশুমে চার্চগুলি নানাভাবে সেজে ওঠে। তাই রবীন্দ্রসদনে এলে কিছুটা সময় আপনি এখানে কাটাতেই পারেন।

১০) বিড়লা প্ল‍্যানেটোরিয়াম

সেন্ট পল ক‍্যাথিড্রাল থেকে বেরোলে সামনেই পেয়ে যাবেন এশিয়ার বৃহত্তম তারামন্ডল – এম.পি বিড়লা প্ল‍্যানেটোরিয়াম। এটি আসলে একটি মহাকাশ চর্চা কেন্দ্র ও জাদুঘর। ১৯৬৩ সালে ত‍ৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জ‌ওহরলাল নেহেরু এটির উদ্বোধন করে। সাঁচীর বৌদ্ধস্তূপের আদলে নির্মিত এই একতলা ভবনটি। তারামন্ডলের মূল আকর্ষণ মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এখানে দিনের বিভিন্নসময় বিভিন্ন ভাষায় (ইংরাজি, বাংলা ও হিন্দি) মহাকাশকেন্দ্রিক বিষয়গুলি প্রদর্শিত হয়। তবে ছুটির দিনে অন‍্যান‍্য ভাষাতেও প্রদর্শন চলে। এছাড়া বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও জ‍্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর গ‍্যালারি রয়েছে। বাচ্চাদের তো বটেই ছাত্রছাত্রী এমনকি বড়দের‌ও একটি অন‍্যতম প্রধান আকর্ষণ থাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্ল‍্যানেটোরিয়ামটি।এখানে মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কিত একটি ফ্রি কোর্সের‌ও ব‍্যবস্থা আছে আগ্রহীদের জন‍্য।

১১) অরবিন্দ ভবন

রবীন্দ্র সদন চত্বর পেরিয়ে থিয়েটার রোড ধরলেই ৮নং শেক্সপীয়র সরণিতে পেয়ে যাবেন পাঁচিল ঘেরা একটি বাড়ি, যার দরজার মাথায় লেখা আছে অরবিন্দ ভবন। ঋষি অরবিন্দ জন্মগ্রহণ করেছিলেন এখানে, তবে এটা ছিল আসলে তার বাবার বন্ধু বাড়ি। পরবর্তীকালে অরবিন্দর বাল‍্যস্মৃতি জড়িত এই ভবনটি ভারতের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিহাসের সাক্ষী থেকে বর্তমানে পরিচিত হয়েছে অরবিন্দ ভবন নামে।
ভবনে ঢুকলেই প্রথমে পাওয়া যাবে সুপ্রাচীন অশ্বত্থ গাছটি আর বামদিকে শ্রী অরবিন্দের ছবি, ব‌ই, ম‍্যাগাজিন, ফুল ধূপের দোকান।
বাড়ির অন্দরমহলের নীচের তলায় আছে লাইব্রেরি, লাইব্রেরি পেরোলেই চোখে পড়বে সাদামার্বেলের ওপর ফুল দিয়ে সাজানো ক্ষেত্রটি, যেটি শ্রী অরবিন্দের পার্থিব অস্থির সমাধিস্থান। শান্ত সৌম‍্য এমন পরিবেশে পারলে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকবেন, মনে শান্তি আসবে। সমাধির সামনেই দেখতে পাবেন পদ্মফুল পরিবেষ্টিত একটি কৃত্রিম পুকুর। এরপর বেশ পুরানো একটি সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় পৌঁছালে দেখবেন চিত্রপ্রদর্শনীশালা।

এছাড়া বাড়িটিতে একটি সাংস্কৃতিকচর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যা ‘অহনা’ নামক একটি কালচারাল গ্রুপ দ্বারা পরিচালিত। তাই রবীন্দ্রসদন বেড়াতে এলে একটু হেঁটে ঘুরে আসুন অরবিন্দ ভবনেও।

ভ্রমণ গাইডের পক্ষ থেকে আপনার জন‍্য বড়দিনের এই বিশেষ উপহার, যেখানে রবীন্দ্রসদনের দর্শনীয় স্থানগুলি নিয়ে সংক্ষেপে পরিচয় করানো হল, যার কোথাও রয়েছে ইতিহাসের গন্ধ কোথাও প্রকৃতির কোথাও আবার বিজ্ঞানের। সব মিলিয়েমাত্র আধঘন্টার দূরত্বের পরিসরের মধ‍্যেই পেয়ে যাবেন এই এগারোটি জায়গা। এবার পছন্দ অনুযায়ী কোনগুলি রাখবেন আপনার একদিনের বেড়ানোর তালিকায় সেটা বেছে নিন আর সামনের বড়দিনেই বেরিয়ে আসুন আপনার প্রিয় কলকাতা থেকে।  

– রুমি